করোনা ভাইরাস: ভারতে লকডাউনের মধ্যে বেড়ে গেছে পারিবারিক সহিংসতা

করোনাভাইরাসজনিত দীর্ঘ লকডাউনের মধ্যে পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের মতই ভারতেও যারা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন – তাদের জন্য এই সময়টা ছিল খুবই দু:সহ। এ নিয়েই বিবিসি তেলুগুর পদ্মা মীনাক্ষির রিপোর্ট। গত ১৮ই এপ্রিলের কথা । ভারতে তখন তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে করোনাভাইরাসজনিত লকডাউন চলছে। তারা নামের এক নারী ( তার অনুরোধে এখানে নামটি পরিবর্তন করা হয়েছে) – পারিবারিক সহিংসতার শিকারদের জন্য ভারতে যেসব হেল্পলাইন আছে তার সন্ধান করতে ইন্টারনেটে ঢুকলেন। তার বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর আগে, এবং তার স্বামী সব সময় তার ওপর নির্যাতন চালাতেন। কখনো মুখের কথায়, কখনো মানসিকভাবে, আর কখনো কখনো শারীরিকভাবে। বিজ্ঞাপন তবে তিনি চাকরি করতেন বলে দিন একটা বড় সময় তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। তার স্বামীকেও কাজের সূত্রে নানা জায়গায় যেতে হতো – ফলে অনেক সময় তিনিও বাইরে থাকতেন । কিন্তু ২৫শে মার্চ থেকে শুরু হওয়া লকডাউনের কারণে সব বদলে গেল। “কখন-কিভাবে স্বামীর মেজাজ খারাপ হয়ে যায় – এ নিয়ে আমি সব সময়ই একটা ভয়ের মধ্যে থাকি” – আমাকে ফোনে বলছিলেন তারা। এই ফোনটাও তিনি করেছেন ঘরের দরজা বন্ধ করে – যাতে তার স্বামী বা শাশুড়ি কোনভাবে তার কথা শুনে না ফেলেন।
তারা বলছেন, স্বামী আর শাশুড়ি দুজনেই তাকে বিদ্রূপ আর হয়রানি করেন।

‍“আমাকে সব সময় বলা হয়, আমি ভালো মা নই, ভালো স্ত্রী নই। তারা আমাকে পনিযমিত অনেক পদ রান্না করে খাওয়াতে বলে, আমার সাথে ঘরের চাকরানির মতো আচরণ করে।‍“

এই নিপীড়ন আর মারধর সহ্য করতে না পেরে অনলাইনে কোথাত সাহায্য নেবার সিদ্ধান্ত নিলেন তারা।

তিনি একটি ফেসবুক পাতার সন্ধান পেলেন যা চালায় ‘ইনভিজিবল স্কারস’ বা অদৃশ্য ক্ষতচিহ্ন নামের একটি সহায়তাকারী সংগঠন – এবং তাদের সাথে যোগাযোগ করলেন।

‍“আমরা এরকম বহু অভিযোগ পাচ্ছি অনেকের কাছ থেকে এবং তারা আমাদের সাহায্য চাইছেন” – বললেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা একতা বিবেক ভার্মা, যার সাথে তারার কথা হয়।

মিজ ভার্মা বললেন, তাদের পক্ষ থেকে তারাকে সব রকম বিকল্প বুঝিয়ে বলা হয়েছে – যার মধ্যে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করা, আইনসম্মত ভাবে আলাদা থাকা, বা তার স্বামীর সাথে কথা বলে তার মানসিক পরামর্শের ব্যবস্থা করা।

তারা বলছেন, তিনি তার স্বামীকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে তিনি পুলিশে অভিযোগ করবেন। তখন কিছুদিনের জন্য নির্যাতন বন্ধ ছিল। কিন্তু তার পর আবার তার শুরু হলো আগের মতোই।

তারা বলছেন, স্বামীর ঘর ছেড়ে আলাদা থাকার বিকল্পটি তার জন্য সম্ভব নয়। তিনি বলছেন, “শুধু ঈশ্বরই আমাকে রক্ষা করতে পারেন। আমি আমার বাবা-মা এবং আমার শিশু সন্তানকে কোন সমস্যায় ফেলতে চাই না।“ লকডাউনে অভিযোগের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে মিজ ভার্মা বলছেন, বেশির ভাগ সময়ই একজন নারী তার নিপীড়ক স্বামীকে ছাড়তে চায় না। বরং এই নারীরা চায় – কীভাবে স্বামীকে একটা শিক্ষা দেয়া যায়, বা কীভাবে তাদেরকে স্ত্রীর প্রতি ভালো আচরণ করতে বাধ্য করা যায়। এর কারণ হলো, বিবাহ বিচ্ছেদকে ভারতীয় সমাজে খারাপ চোখে দেখা হয়। কোন মেয়ে যদি নির্যাতনের কারণে বিয়ে ভেঙে দিতে চায় তাহলে খুব কম পরিবারই তা সমর্থন করে – বিশেষ করে যদি সেই মেযেটির সন্তান থাকে। তারার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে।
বিশেষ করে লকডাউনের কারণে যখন যানবাহন চলাচল খুবই সীমিত, তখন স্বামীকে ছেড়ে কোন আশ্রয়ে গিয়ে থাকা, বা বাবা-মায়ের সাথে থাকা অত্যন্ত কঠিন। ভারতে ২০১৮ সালে নারীর বিরুদ্ধে যত অপরাধ পুলিশের তালিকাভুক্ত হয়েছে –তার মধ্যে ৩২ শতাংশ বা এক তৃতীয়াংশই হচ্ছে “স্বামী বা তার আত্মীয়স্বজনদের নিষ্ঠুরতা।“ পুলিশ ২০১৮ সালে এমন ১ লক্ষ ৩ হাজার ২৭২টি কেস নিবন্ধন করেছে। ভারতের একটি সরকারি জরিপ আছে যার নাম ‘জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য জরিপ’ । ২০১৫-১৬ সালে এই জরিপে দেখা যায় প্রায় ৩৩ শতাংশ নারীই স্বামীর দ্বারা শারীরিক, যৌন, বা মানসিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। এতে আরো দেখা যায় যে সহিংসতার শিকার হওয়া নারীদের মাত্র ১৪ শতাংশ এমন আচরণ থামানোর জন্য কোন রকম সহায়তা নিয়েছেন।
তা সত্বেও ভারতের নারী বিষয়ক জাতীয় কমিশন বলছে, তারা লকডাউনের সময় অভিযোগের সংখ্যায় উর্ধ্বগতি লক্ষ্য করেছেন।

কমিশনের চেয়ারপারসন রেখা শর্মা বিবিসিকে একথা বলেছেন।

এই বৃদ্ধি এতটাই ছিল যে লকডাউনের সময় মহিলাদের সাহায্য করতে হোয়াটসএ্যাপে একটি হেল্পলাইন চালু করেন। হোয়াটসএ্যাপ ভারতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, এবং যে মহিলারা কেউ শুনে ফেলবে এই ভয়ে ফোন করতে পারে না তাদের জন্য একটি নিরাপদ বিকল্প।

এ বছর ২৩শে মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ই এপ্রিল পর্যন্ত – যাকে বলা যায় লকডাউনের মোটামুটি প্রথম তিন সপ্তাহ – পারিবারিক সহিংসতার ২৩৯টি অভিযোগ পায় কমিশন।

লকডাউনের আগে এক মাসে যেখানে তারা ১২৩টি অভিযোগ পেয়েছিল – সে হিসেবে এ সংখ্যা অনেকটা বেশি।

“‍লকডাউনের বিধিনিষেধের কারণে নির্যাতনকারী হতাশ এবং ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে কারণ তার মনে হয় সে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে” – বলেন অধ্যাপক অশ্বিনী দেশপাণ্ডে, দিল্লির অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অর্থনীতিবিদ।

‍“এর ফলে সে নির্যাতনের মাধ্যমে তার সঙ্গী বা সন্তানদের ওপর আরো বেশি করে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে উদ্বুদ্ধ হয়” – বলেন তিনি।

মিজ দেশপাণ্ডে ২০২০ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে কমিশনের পাওয়া অভিযোগগুলোর সাথে গত বছরের একই সময় পাওয়া অভিযোগগুলো তুলনা করেছেন। তিনি দেখেছেন যে গত বছর তারা গড়ে প্রতিদিন পাঁচটি অভিযোগ পেতেন, কিন্তু এ বছর পেয়েছেন গড়ে প্রতিদিন নয়টি অভিযোগ।

এটা যে শুধু ভারতেই ঘটেছে তা নয়। এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে জাতিসংঘের মহাসচিব এ্যান্টোনিও গুটেরেস বলেছিলেন, লকডাউনের মধ্যে বিশ্বব্যাপি পারিবারিক সহিংসতা ভীতিকর রকমে বেড়ে গেছে।

জাতিসংঘ বলছে, লেবানন ও মালয়েশিয়ায় সে সময় হেল্পলাইনে ফোনের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। চীনে তা বেড়ে যায় তিন গুণ।

ভারতে পারিবারিক সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়াদের জন্য একটি হেলপলাইন চালায় স্নেহা নামে একটি সংগঠন। এর কর্মকর্তা নায়রিন দারুওয়ালা বলেন, ভারতের মত দেশে নারদের পক্ষে তার অভিযোগ নিয়ে রিপোর্ট করা সহজ নয়।

এ সংগঠনটি বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিখ্যাত ব্যক্তিদেরকে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও অর্থসংগ্রহের কর্মসূচির সাথে জড়িত করেছে।

মিজ দারুওয়ালা বলছেন ইনস্টাগ্রামে তাদের এ উদ্যোগ ভালো সাড়া পেয়েছে এবং তারা আশা করছে, এর ফলে তারা আরো বেশি নারীর কাছে পৌঁছাতে পারবে।

ভয়ের মধ্যে বসবাস
সাধারণত: এ ধরণের ঘটনায় প্রথম সাড়া দেয় পুলিশ। কিন্তু ভারতে মনে করা হয় পুলিশের নারীর ক্ষেত্রে সমবেদনার অভাব আছে।

তা ছাড়া লকডাউনের সময় কারফিউ রক্ষা করা এবং কনট্যাক্ট ট্রেসিংএর মতো কাজ নিয়ে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়।

তবে মিজ দেশপাণ্ডে বলেন, সমস্যায় পড়া নারীদের সহায়তা না করার এগুলো কারণ হতে পারে না।

তিনি মনে করেন, নির্যাতনের শিকার নারীদের যেন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া যায়, সেজন্য পুলিশের সহায়তাকে একটা জরুরি সেবা হিসেবে সরকারের শ্রেণীভুক্ত করা উচিত।

এ ক্ষেত্রে শোনা যাক লক্ষ্মীর অভিজ্ঞতা (তার নামও এখানে বদলে দেয়া হয়েছে)।

তার স্বামী অতিমাত্রায় মদ্যপান করতো এবং প্রায়ই সহিংস হয়ে উঠতো।

“সে আমাকে ধর্ষণ করতো” – লক্ষ্মী বলেন, “সে আমাকে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে না দেখে তার যৌন ইচ্ছা পূরণের একটা সামগ্রীর মতো আচরণ করতো।“

অতীতে লক্ষ্মী এধরণের পরিস্থিতিতে কয়েকদিনের জন্য তার বাবা-মায়ের বাড়িতে চলে যেতেন। কিন্তু লকডাউনের সময় সেটা সম্ভব ছিল না।

এর পর তিনি আবিষ্কার করলেন যে তার স্বামী একজন যৌনকর্মীর কাছে যাচ্ছে।

লক্ষ্মীর মনে ভয় তৈরি হলো যে তার স্বামী হয়তো করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারে, এবং তার মাধ্যমে তিনি নিজে এবং ছেলেমেয়েরাও আক্রান্ত হতে পারে।

তখন তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেন।

পুলিশ এসে তার স্বামীকে সতর্ক করলো, তার মোটরবাইক জব্দ করলো – যাতে সে বাড়ি থেকে বেরুতে না পারে। কিন্তু তাকে আটক করলো না।

সেদিন বাড়ি ফিরে স্বামী লক্ষ্মীকে প্রচন্ড মারধর করলো। তার মনে হলো, এখানেই সব শেষ।

তার ৯ বছরের মেয়ে দৌড়ে গিয়ে প্রতিবেশিদের খবর দিলো। তাদের সহায়তায় তিনি ডাক্তারের কাছে গেলেন, এবং মামলা করতে থানায় গেলেন।

‍“আমি ভাবলাম আমার অবস্থা দেখে নিশ্চয়ই তারা অভিযোগ গ্রহণ করবে, স্বামীকে গ্রেফতার করবে।“

কিন্তু তারা তা করতে অস্বীকার করলো, লক্ষ্মীকে চলে যেতে বললো।

“আমি অপমানিত এবং অসহায় বোধ করলাম। বাড়ি ফিরতেও ভয় করতে লাগলো। যদি সে আমাকে মেরে ফেলে?”

পরদিন খুব সকালে তিনি দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে তার বাবা-মায়ের বাড়িতে চলে গেলেন।

এখনো ঘরে ফেরেন নি লক্ষ্মী । তিনি বলছেন, তার স্বামীও তার সাথে যোগাযোগ করে নি।

ফলে লকডাউনের মধ্যে আমার জীবন এখন অনিশ্চিত –বলছেন লক্ষ্মী।