আবাসন থেকে উচ্ছেদের হুমকি! অমানবিক আচরণে হতাশ হলদিয়ার বিএমওএইচ, ভীতও

হলদিয়ার বিএমওএইচ দিব্যজ্যোতি বসুকে আবাসন থেকে তুলে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন আবাসিকরা। যেখানে করোনা নিয়ে ছুটোছুটি চলছে সারাদিন, সেখানে পড়শিদের এই আচরণে ব্যথিত চিকিৎসক। পরিবার নিয়ে ভয়েও দিন কাটছে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখলেন লাবডুব-এর পাতায়

আমি মফস্‌সলের ছেলে। পয়সা রোজগারের জন্য ডাক্তার হইনি। ছোট থেকে প্যাশনেট ছিলাম খুব। মানুষের খারাপ দেখলে ভাবতাম যদি কিছু করতে পারি। সেই ভাবনার জায়গা থেকেই ডাক্তারিতে আসা।

বাঁকুড়া থেকে হলদিয়ায় আসার পর পাঁচ বছর হয়ে গেল। নতুন জায়গা, সবটাই মানিয়ে নিয়েছিলাম। ভালোই ছিলাম। কিন্তু শেষ দু’মাস ধরে আমার সঙ্গে যা ঘটে চলেছে, তাতে খুবই দুঃখ পাচ্ছি। এটাই বোঝানো হচ্ছে, আমি আমার আবাসনে অবাঞ্ছিত। পেশার জন্য করোনা সংক্রমণের বিষয়টি সামলাচ্ছি বলে অন্য আবাসিকরা আমাকে থাকতে দেবে না, সেটা সরাসরি হয়তো বলছে না। কিন্তু আমাকে তুলে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে এরা!

করোনার জন্য আমরা সকলেই ঘরে বা আবাসনে বন্দি। কোথাও যাওয়ার নেই। ফলে আবাসনের লোকেরাই আমাদের আত্মীয়। সকলের সঙ্গেই আমার ভালো সম্পর্ক। বিপদে-আপদে ডাকলে ডাক্তার হিসেবে যতটা করা যায় করেছি। কারও মায়ের রাতবিরেতে প্রেশার বেড়ে গিয়েছে, গিয়ে দেখে এসেছি। নীচের এক বাসিন্দা প্রেগনেন্ট। লকডাউনের মধ্যে কোথায় কী পাওয়া যাবে, সমস্ত খোঁজ দিয়েছি ওঁদের। মাস্ক, স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা পর্যন্ত করে দিয়েছি। তাঁদের দিক থেকে এই ধরনের ব্যবহারে খুবই দুঃখ পেয়েছি।

আমাদের আবাসনে আটটা ফ্ল্যাট রয়েছে। তার একটিতে পাঁচ বছর ধরে ভাড়ায় রয়েছি। ভাড়ায় থাকতে হলে যে অন্যকে একটু সমঝে চলতে হয়, সেটাই জানি, মানি। সমস্যা টুকটাক হয়ে থাকে, আবার ঠিকও হয়ে যায়। কিন্তু শেষ দু’মাস ধরে আমার বাচ্চাকে নিয়ে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করছে। ছাদে গেলে সমস্যা। কি না আমার তিন বছরের বাচ্চা ছাদে দৌড়োদৌড়ি করলে নীচের ফ্ল্যাটের বাসিন্দার মাইগ্রেনের সমস্যা বেড়ে যায়। অথচ, তাঁর ছেলে প্রতিদিন সকালে ঘণ্টাখানেক উফার বাজিয়ে গান চালায়! তার পর থেকে ছেলেকে আর ছাদে উঠতে দিইনি। নীচেও আর খেলতে নিয়ে যাই না। আসলে একটু ভয়ে ভয়ে থাকি। হাজার স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাটেই ওর দৌরাত্ম্য। গত রবিবার রাতে আমার ছেলে ঘুমোচ্ছে না। খালি বলছে খেলব। তখন সাইকেল দিয়ে বললাম, ঘরের মধ্যেই চালা। তখন বারতিনেক দরজায় ধাক্কা মেরেছে। কিছুটা শব্দ হয়েছে। আমি বকিও ওকে। কান্নাকাটি করে ঘুমোতে চলে যায়।

আমাদের আবাসনের বাসিন্দাদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে। সকালে উঠে দেখি, আলোচনা হয়েছে, থ্রিএ ফ্ল্যাট থেকে বিরক্তিকর আওয়াজ আসছে। এক্ষুণি এটা বন্ধ করা দরকার। একজন আবাসনে থাকেন না, তিনি লিখেছেন, এ বার কিন্তু সবাই মিলে এদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া দরকার। আমি তখন গ্রুপে লিখলাম, ছেলে খেলতে খেলতে শব্দ হয়েছে। আমাকে বলা হল, অনেক অজুহাত শুনেছি। সব বাচ্চার উপর চালানোর চেষ্টা করবেন না!

আমি তখন এক আবাসিককে ফোন করি। ওর সঙ্গে আমাদের খুবই ভালো সম্পর্ক। ফোন করতেই বললেন, ‘আপনি এখনও এখানে কী ভাবে আছেন, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। আমরা আপনার বাড়িওয়ালাকে লিখিত অভিযোগ করেছি।’ আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! বাড়িওয়ালাকে ফোন করি। উনি বলেন, ‘ওসব পরে হবে। লকডাউন কাটুক।’ আমি তখন কমপ্লেনের কপি চাই। সেটা আজ পর্যন্ত পাইনি।

লকডাউনের ঠিক আগে আবাসনের লিফটটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাতে বাইরের লোকেরা উঠতে না পারে। আমাকে নিয়মিত বাইরে বেরোতে হয়। হেঁটে উঠি, নামি। ভারী মালপত্র নিয়েও উঠতে হয়। তা-ও মেনে নিতে সমস্যা হয়নি। গত রবিবার দেখলাম পাঁচতলায় লিফটটা উঠল, নামল। এর অর্থ, কিছু জনের জন্য লিফটটা চলছে!

পূর্ব মেদিনীপুরে কন্টেনমেন্ট জোন রয়েছে। আমার ব্লকেই ৯টা কেস। ফলে আমাদের উপর প্রবল চাপ। দশটায় বেরোই। সন্ধের পর ফিরি। করোনার জন্য চার দিকে ছুটে বেড়াচ্ছি। নানারকম টেনশনে দিন কাটছে। এখন এমন অবস্থা হয়েছে, বাড়ি ফিরেই সোজাসুজি বাচ্চাটার কাছে যেতে পারি না। তার মধ্যে এরা আমাকে তুলে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগছে। শিক্ষিত ব্যবহার এরকম হতে পারে, জানা ছিল না। শিক্ষিত হিসেবে নিজেরই লজ্জা লাগছে।

সহকর্মীদের পরামর্শে থানায় অভিযোগ জানিয়ে রেখেছি। কাউকে শাস্তি দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু আমি যাতে পরিবার নিয়ে নির্বিঘ্নে থাকতে পারি, সেটা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব!